ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপে (Tata Group) আবার এক বিরাট নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। টাটা সন্স (Tata Sons)-এর চেয়ারম্যান পদে থাকা এন চন্দ্রশেখরন (N Chandrasekaran) তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষে আর নতুন করে দায়িত্ব নিচ্ছেন না এবং তিনি এই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৪ দশকের বেশি সময় টাটা পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং গত ১০ বছর ধরে টাটা সন্সের হাল ধরা এই কর্পোরেট ব্যক্তিত্বের হঠাৎ কেন এই পদত্যাগ? কেনই বা সৃষ্টি হলো এই পরিস্থিতি? N Chandrasekaran Resigns why – এই প্রশ্নের উত্তর এবং বোর্ড রুমের ভেতরের আসল প্রেক্ষাপট জানতে পুরো বিষয়টি বিস্তারিত বুঝে নেওয়া যাক।
১. সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থনের অভাব (Lack of Unanimous Support)
এন চন্দ্রশেখরনের পুনরায় দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ড রুমে মতানৈক্য তৈরি হওয়াই তাঁর পদত্যাগের সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ কারণ।
- বোর্ড রুমের অচলাবস্থা: স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট এবং স্যার রতন টাটা ট্রাস্ট তাঁর মেয়াদ আরও ৫ বছরের জন্য বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত টাটা সন্সের বোর্ড মিটিংয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক এই প্রস্তাবে সায় দেননি।
- ঐতিহ্য বজায় রাখার মানসিকতা: টাটা গ্রুপের সংস্কৃতিতে যেকোনো সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শতভাগ সমর্থন না পাওয়ায় চন্দ্রশেখরন নিজে থেকেই বিষয়টি স্থগিত রাখার অনুরোধ করেন। টানা ৬ মাস কোনো সমঝোতা না হওয়ায় তিনি আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর আর এই পদে না থাকার সিদ্ধান্ত টাটা সন্সের বোর্ডকে জানিয়ে দেন।
ঘটনাপ্রবাহ: ট্রাস্টের সুপারিশ (৫ বছর মেয়াদ বৃদ্ধি) ➔ বোর্ডে পেশ ➔ ১ জন পরিচালকের দ্বিমত ➔ ৬ মাসের অচলাবস্থা ➔ পদত্যাগের ঘোষণা
২. নোয়েল টাটা এবং টাটা ট্রাস্টের সাথে মতপার্থক্য
টাটা সন্সের ৬৬% শেয়ার রয়েছে টাটা ট্রাস্টের অধীনে। রতন টাটার প্রয়াণের পর নোয়েল টাটা (Noel Tata) ট্রাস্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতিগত কিছু পার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে।
- শর্তাবলী সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব: সূত্রে জানা যায়, নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন ট্রাস্ট কিছু নতুন শর্ত প্রস্তাব করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল— টাটা সন্সকে কখনোই স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত (IPO/Listing) করা যাবে না। চন্দ্রশেখরন এরকম কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি ছিলেন না।
- বোর্ড প্রতিনিধিত্ব: পরিচালন পর্ষদে টাটা ট্রাস্টের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তে ট্রাস্টের কতটা কর্তৃত্ব থাকবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে নীতিগত ফারাক দেখা দেয়।
৩. অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লোকসান এবং ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স
চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে টিসিএস (TCS), টাটা মোটরস (Tata Motors) কিংবা টাটা স্টিল দুর্দান্ত উন্নতি করলেও, গ্রুপের বেশ কিছু অ-তালিকাভুক্ত বা নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ বিশাল অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে।
- এয়ার ইন্ডিয়া (Air India): এয়ার ইন্ডিয়া অধিগ্রহণের পর পরিষেবা উন্নত ও পুনর্গঠন করতে গিয়ে বিপুল অর্থের ব্যয় হয়েছে। ফলে ২০২৬ আর্থিক বছরে এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২,২৩৮ কোটি টাকায়।
- টাটা ডিজিটাল (Tata Digital): গ্রুপের ই-কমার্স অ্যাপ ‘Tata Neu’ তৈরি এবং চালনার দায়িত্বে থাকা টাটা ডিজিটালও প্রায় ৪,৯৭৪ কোটি টাকার বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হয়।
- বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন: ট্রাস্টের তরফ থেকে এসব ব্যবসায়ে অতিরিক্ত আর্থিক লোকসান এবং দীর্ঘমেয়াদী লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
৪. ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা কাটানো এবং ট্রানজিশনের উদ্যোগ
চন্দ্রশেখরন তাঁর বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, টাটা গ্রুপ অত্যন্ত বিশাল এবং এই মুহূর্তে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) ও বিমান চলাচলের মতো একাধিক বড় প্রজেক্ট মাঝপথে রয়েছে।
“প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানোর জন্য দ্রুত নতুন উত্তরসূরি (Successor) নির্বাচন করা জরুরি।”
সে কারণেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন, যাতে বোর্ড উপযুক্ত সময়ের মধ্যে একটি নির্বিঘ্ন ট্রানজিশন পরিচালনা করতে পারে।
টাটা গ্রুপের ভবিষ্যৎ কী?
এন চন্দ্রশেখরনের সরে দাঁড়ানোর খবরে টাটা গ্রুপের একাধিক শেয়ারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন। আগামী দিনে কে টাটা सन्সের নতুন চেয়ারম্যান হবেন— ভেতরের কেউ নাকি বাইর থেকে কোনো দক্ষ পেশাদারকে আনা হবে— সেদিকেই এখন পুরো বৈশ্বিক কর্পোরেট বিশ্বের নজর।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













