সুদীপ্ত সাউ, কলকাতা: বাঙালির সবচেয়ে বড় আনন্দঘন উৎসবের শেষ পর্যায় হলো বিজয়া দশমী। শরৎকালের কাশফুল, শিউলি আর ঢাকের আওয়াজে যে আনন্দের জোয়ার আসে, দশমীর বিষাদমাখা বিকেলে সেই আলো স্তিমিত হয়ে আসে মায়ের বিদায়যাত্রায়। ২০২৬ সালের শারদোৎসবে দশমীর দিনটি প্রতিটি বাঙালির মনে জাগিয়ে তুলছে এক মিশ্র অনুভূতি—একদিকে বছর ঘুরে মায়ের আবার ফিরে যাওয়ার বিষাদ, অন্যদিকে শুভ বিজয়ার মিলনোৎসব ও নতুন সূচনার আনন্দ। Durga Visarjan 2026 কেবল মা দুর্গার প্রতিমা জলে বিসর্জন নয়, এটি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মঙ্গলের আবাহনের এক পবিত্র ঐতিহ্য।
বিজয়া দশমী ও বিসর্জনের ধর্মীয় মাহাত্ম্য
পৌরাণিক শাস্ত্রানুযায়ী, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে অশুভের ওপর শুভ ও ন্যায়ের জয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই বিশেষ তিথিতে। দশ দিনব্যাপী যুদ্ধজয়ের পর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে তিনি মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে স্বামী মহাদেবের কাছে ফিরে যান। তাই এই দিনটি একদিকে যেমন দেবীর জয়োল্লাস, অন্যদিকে কন্যার পিতৃগৃহ ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার আবেগঘন মুহূর্ত। বিসর্জনের মাধ্যমে ভক্তরা দেবীকে প্রণাম জানিয়ে বিদায় জানান এবং মনে মনে উচ্চারণ করেন—‘আসছে বছর আবার হবে’।
দুর্গাপূজা ২০২৬: তিথি ও বিসর্জনের শুভ মুহূর্ত
পঞ্জিকা অনুসারে ২০২৬ সালের আশ্বিন মাসে শারদীয়া দুর্গাপূজার মহাদশমী অনুষ্ঠিত হবে। শাস্ত্রমতে, দশমী তিথির নির্দিষ্ট অপরাজিতা পূজা এবং দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমেই পূজার আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটে।
| আচার / পূজা পর্ব | তাৎপর্য |
|---|---|
| দশমী বিহিত পূজা | দশমী তিথিতে দেবীর শেষ অর্চনা ও শান্তি জল গ্রহণ। |
| দর্পণ বিসর্জন | একটি জলপূর্ণ পাত্রে দেবীর প্রতিচ্ছবি দেখে আনুষ্ঠানিক প্রাণ বিসর্জন। |
| অপরাজিতা পূজা | জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপরাজেয় থাকার সংকল্প নিয়ে বিশেষ পূজা। |
| প্রতিমা বিসর্জন (Visarjan) | নদী, হ্রদ বা নির্ধারিত জলাশয়ে দেবীর কাঠামো নিমজ্জিত করা। |
মনে রাখা প্রয়োজন: সঠিক তিথি ও শুভ ক্ষণ মেনে দর্পণ বিসর্জন করা শাস্ত্রীয় নিয়ম। স্থানীয় পঞ্জিকা ভেদে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা হেরফের হতে পারে, তাই স্থানীয় পুরোহিতের নির্দেশিত সময়সূচি মেনে চলাই শ্রেয়।
সিঁদুর খেলা ও বিদায় আরতির ঐতিহ্য
প্রতিমা ঘাটে নিয়ে যাওয়ার আগে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় সধবাদের অন্যতম প্রিয় অনুষ্ঠান—সিঁদুর খেলা। পানপাতা, মিষ্টি আর সিঁদুর নিয়ে মায়েরা দেবীকে বরণ করেন। দেবীর কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে তাঁর মুখে মিষ্টি তুলে দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘দেবী বরণ’। এরপর উপস্থিত নারীরা একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে তোলেন, যা দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সৌভাগ্য ও পরস্পরের মঙ্গল কামনার প্রতীক। এই সময়ে ঢাকের কাঠি যেন বেজে ওঠে এক ভারী সুরে, যেখানে মিশে থাকে এক গভীর আবেগ।
শুভ বিজয়ার কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখ Durga Visarjan 2026
বিসর্জনের পর শুরু হয় সামাজিক মিলনের পালা। বয়স ও সম্পর্কের বিভেদ ভুলে ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা মেতে ওঠে সৌহার্দ্যের কোলাকুলিতে।
- ঘরে ঘরে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী নিমকি, মোয়া, গুড়ের নাড়ু এবং জিভে জল আনা রসগোল্লা।
- শত্রুতা ভুলে সবাই মিলে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন এই শুভ বিজয়া।
- বর্তমান আধুনিক যুগে দূর-দূরান্তে থাকা প্রিয়জনদের কাছে ডিজিটাল মাধ্যমে পৌঁছে যায় বিজয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
পরিবেশবান্ধব বিসর্জন: সচেতনতার ডাক
বর্তমান সময়ে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রে এখন সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেশি:
- প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার: সীসা ও রাসায়নিকমুক্ত মাটির প্রতিমা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
- কৃত্রিম জলাশয় ও ঘাট ব্যবস্থাপনা: নদীর জল দূষণমুক্ত রাখতে বিভিন্ন পৌরসভা ও প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে বিশেষ বিসর্জন কৃত্রিম ঘাট।
- কাঠামো দ্রুত উত্তোলন: বিসর্জনের পরপরই জল থেকে দেবীর খড় ও কাঠের কাঠামো ক্রেনের সাহায্যে তুলে ফেলা হচ্ছে।
উৎসবের মর্যাদা তখনই অক্ষুণ্ণ থাকে যখন আমরা পরিবেশকে রক্ষা করে মায়ের আরাধনা ও বিদায় সম্পন্ন করতে পারি।
Durga Visarjan 2026 আমাদের জীবনে নিয়ে আসুক শুভ চেতনা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আগামী দিনের সমৃদ্ধির বার্তা। মায়ের বিদায়লগ্নে সমস্ত অশুভ শক্তি ও কালিমা দূর হোক, প্রতিটি ঘরে ফিরে আসুক অনাবিল শান্তি ও আনন্দ। শুভ বিজয়া!
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













