Nirjala Ekadashi Vrat Katha হিন্দু ধর্মে একাদশী ব্রতের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আচার। বছরে মোট ২৪টি একাদশী থাকলেও জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের নির্জলা একাদশী সবচেয়ে কঠিন ও পবিত্র বলে বিবেচিত। “নির্জলা” শব্দের অর্থই হলো জলবিহীন – অর্থাৎ এই ব্রতে খাদ্যের পাশাপাশি জল পর্যন্ত গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। এই নিবন্ধে আমরা জানবো নির্জলা একাদশী ব্রত কথা, এর মাহাত্ম্য, পালনপদ্ধতি এবং ২০২৬ সালের শুভ সময়সূচী।
নির্জলা একাদশী ২০২৬: তিথি ও শুভ মুহূর্ত
২০২৬ সালের নির্জলা একাদশীর সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
- একাদশী তিথি শুরু: ২৪শে জুন, ২০২৬ – সন্ধ্যা ০৮ টা ০৯ মিনিট।
- একাদশী তিথি শেষ: ২৫শে জুন, ২০২৬ – সন্ধ্যা ০৯ টা ১৪ মিনিট।
- পারণের সময়: ২৬শে জুন, ২০২৬ – সকাল ০৫ টা ২৫ মিনিট থেকে সকাল ০৮ টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত। একাদশীর পরের দিন সূর্যোদয়ের পর নিয়ম মেনে জল ও খাদ্য গ্রহণ করে ব্রত ভঙ্গ করতে হয়।
Nirjala Ekadashi Vrat Katha: নির্জলা একাদশীর পৌরাণিক কাহিনী
নির্জলা একাদশীকে অনেকেই ‘ভীমসেনী একাদশী’ বা ‘পাণ্ডব একাদশী’ বলে থাকেন। এর পেছনে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে, যা মহাভারতের সাথে যুক্ত।
ভীমের ভোজন রসিকতা ও মহর্ষি ব্যাসদেবের পরামর্শ
মহাভারত অনুযায়ী, পাণ্ডবদের মধ্যে অর্জুন, যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব এবং মাতা কুন্তী ও দ্রৌপদী— সকলেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বছরের প্রতিটি একাদশী ব্রত পালন করতেন। একাদশীর দিন তারা সম্পূর্ণ উপবাস রাখতেন। কিন্তু দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম ছিলেন অত্যন্ত ভোজনরসিক। তাঁর পেটে ‘বৃক’ নামক এক অগ্নি ছিল, যার কারণে খিদে সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তিনি কোনোভাবেই উপবাস করতে পারতেন না।
এই নিয়ে ভীম অত্যন্ত মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন। তিনি ভাবতেন, ব্রত না করার কারণে তিনি হয়তো ভগবানের কৃপা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং নরকগামী হবেন। এই সমস্যার সমাধানের জন্য ভীম মহর্ষি বেদব্যাসজির শরণাপন্ন হন।
ব্যাসদেবের বিধান এবং নির্জলা একাদশী
ভীম মহর্ষি ব্যাসদেবকে বলেন, “হে পিতামহ! আমার পরিবারের সবাই একাদশীর দিন উপবাস করে ভগবানের আরাধনা করে। কিন্তু আমি খিদে মোটেও সহ্য করতে পারি না। দয়া করে আমাকে এমন কোনো সহজ উপায় বলুন, যাতে আমি উপবাস না করেও সমস্ত একাদশীর সমপরিমাণ পুণ্য ফল লাভ করতে পারি এবং মোক্ষ লাভ হয়।”
ভীমের আকুলতা দেখে মহর্ষি ব্যাসদেব মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “হে ভীম! যদি তুমি নরকের কষ্ট থেকে বাঁচতে চাও এবং পরমপদ লাভ করতে চাও, তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে অন্ন এবং জল ত্যাগ করে উপবাস রাখো। এই একটি একাদশী ব্রত পালন করলে বছরের বাকি ২৪টি একাদশী ব্রতের সমান পুণ্য অর্জিত হয়।”
ভীমের কঠিন সংকল্প
ব্যাসদেবের কথা শুনে ভীমচন্দ্র অত্যন্ত সাহস জোগালেন এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের সেই কঠিন একাদশীর দিন জলস্পর্শ না করে উপবাস ব্রত পালন করলেন। দ্বাদশীর দিন সকালে স্নান ও পুজো সেরে তিনি ব্রত ভঙ্গ (পারণ) করেন। উপবাসের কঠিন নিয়মের কারণে ভীম অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, পরে গঙ্গাজল ও তুলসী দিয়ে তাঁর চেতনা ফেরানো হয়। ভীম এই ব্রত সফলভাবে পালন করেছিলেন বলেই এর নাম হয় ভীমসেনী একাদশী বা নির্জলা একাদশী।
নির্জলা একাদশী ব্রতের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব
সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, নির্জলা একাদশী ব্রত পালন করলে মানুষের সমস্ত জানা-অজানা পাপ ধুয়ে মুছে যায়।
- পূর্ণ একাদশীর ফল: যারা সারাবছর কোনো কারণে অন্য একাদশীগুলো পালন করতে পারেন না, তারা যদি কেবল এই একটি নির্জলা একাদশী পূর্ণ নিয়ম মেনে করেন, তবে পুরো বছরের একাদশী পালনের ফল মেলে।
- মানসিক ও শারীরিক শুদ্ধি: তীব্র গরমের মধ্যে জল ছাড়া উপবাস করা মানুষের আত্মসংযম এবং ইচ্ছাশক্তিকে চরম মাত্রায় নিয়ে যায়। এটি শরীরকে ডিটক্সিফাই করতেও সাহায্য করে।
- বিষ্ণু কৃপা: এই দিন ভগবান বিষ্ণুর পূজা করলে জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তি বজায় থাকে এবং মৃত্যুর পর মোক্ষ লাভ হয়।
নির্জলা একাদশী ব্রত পালনের নিয়মাবলী
নির্জলা একাদশীর মূল নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. জল ও অন্ন ত্যাগ: একাদশী তিথির সূর্যোদয় থেকে শুরু করে পরের দিন দ্বাদশীর সূর্যোদয় পর্যন্ত জল এবং খাদ্য সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। (তবে আচমনের সময় মাত্র কয়েক ফোঁটা জল মুখে নেওয়া যায়)।
২. বিষ্ণু পূজা: এই দিন সকালে উঠে স্নান সেরে হলুদ বস্ত্র পরিধান করে ভগবান বিষ্ণু ও মাতা লক্ষ্মীর পূজা করতে হয়।
৩. দান-ধ্যান: জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র গরমে এই দিন ছাতা, জলভর্তি কলসি, পাখা, ফল এবং মিষ্টি দান করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
৪. রাত জাগরণ: একাদশীর রাতে ঘুমানোর চেয়ে ভগবান বিষ্ণুর মন্ত্র জপ এবং কীর্তন করা বেশি ফলদায়ক।
শেষ কথা
Nirjala Ekadashi Vrat Katha আমাদের শেখায় যে, ভক্তি ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব। আপনি যদি এই বছর নির্জলা একাদশী ব্রত পালন করতে চান, তবে নিজের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এবং ভক্তিভরে ভগবান বিষ্ণুর স্মরণ করে ব্রত শুরু করুন।
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













