কেরলের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ প্রকৃতি, ব্যাকওয়াটার আর নারকেল গাছের সারি। কিন্তু এই রাজ্যের সংস্কৃতিকে পূর্ণতা দেয় তার ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘ওনাম’ (Onam)। প্রতি বছর অত্যন্ত ধুমধাম করে মালয়ালি সম্প্রদায় এই উৎসব পালন করে। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, Why Onam is celebrated for 10 days বা ওনাম কেন টানা ১০ দিন ধরে উদযাপন করা হয়?
এটি কেবল একটি সাধারণ উৎসব নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক, পৌরাণিক এবং সামাজিক তাৎপর্য। দক্ষিণ ভারতের এই ফসলি উৎসবের (Harvest Festival) প্রতিটি দিনের একটি নির্দিষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, ওনামের এই ১০ দিনের উদযাপনের পেছনের আসল রহস্য এবং প্রতিটি দিনের বৈশিষ্ট্য।
ওনাম উদযাপনের পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
ওনাম উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অসুররাজ মহাবলী এবং ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারের কাহিনী। পৌরাণিক কথা অনুযায়ী, রাজা মহাবলী ছিলেন অত্যন্ত প্রজাবৎসল, দানশীল এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর রাজত্বকালে কেরলে কোনো দুঃখ, দারিদ্র্য বা বৈষম্য ছিল না। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় দেবতারা ভীত হয়ে পড়েন এবং ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন।
বিষ্ণুদেব তখন বামন (বামন ব্রাহ্মণ) রূপ ধারণ করে মহাবলীর কাছে আসেন এবং তিন পা ভূমি ভিক্ষা চান। দাতা মহাবলী তাতে রাজি হলে, বামন অবতার বিশাল রূপ ধারণ করে দুই পায়ে স্বর্গ ও মর্ত্য মেপে নেন। তৃতীয় পায়ের জন্য জায়গা না থাকায় রাজা মহাবলী নিজের মাথা এগিয়ে দেন। বিষ্ণু তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে পাতাল লোকে পাঠিয়ে দেন এবং বছরে একবার নিজের প্রিয় প্রজাদের দেখতে মর্ত্যে আসার বর দেন। রাজা মহাবলীর এই বার্ষিক গৃহপ্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করেই ওনাম উদযাপিত হয়। আর এই পুরো আগমন ও বিদায়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ১০ দিন ধরে।

ওনামের ১০ দিনের তাৎপর্য (Day-by-Day Breakdown)
মালয়ালি পঞ্জিকা চিংগম (Chingam) মাসে এই উৎসব শুরু হয়। আত্থাম (Atham) নক্ষত্র থেকে শুরু করে থিরুভোনাম (Thiruvonam) নক্ষত্র পর্যন্ত এই ১০ দিন ধরে চলে উৎসব।
১. প্রথম দিন: আত্থাম (Atham)
এই দিন থেকে ওনামের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে রাজা মহাবলী পাতাল থেকে কেরলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। বাড়ির উঠানে ‘পুকালম’ (Pookalam) বা ফুলের আলপনা দেওয়া শুরু হয় এই দিন থেকে। প্রথম দিনে পুকালমের আকার ছোট থাকে এবং কেবল হলুদ ফুল ব্যবহার করা হয়।
২. দ্বিতীয় দিন: চিথিরা (Chithira)
দ্বিতীয় দিনে উৎসবের আমেজ আরও বাড়ে। এই দিনে পুকালমে আরও দুটি নতুন স্তরের ফুল যোগ করা হয়। বাড়ির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং উৎসবের কেনাকাটার জন্য এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. তৃতীয় দিন: চোথি (Chodhi)
এই দিন থেকে বাজারে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে নতুন পোশাক (Onakkodi) এবং গয়না কেনার জন্য এটি আদর্শ দিন। পুকালমের আকার আরও বড় করা হয় এবং বিভিন্ন রঙের ফুলের ব্যবহার বাড়ে।
৪. চতুর্থ দিন: বিশাখাম (Visakam)
ওনামের রান্নাবান্নার প্রস্তুতি মূলত এই দিন থেকে শুরু হয়। কেরলের প্রতিটি ঘরে নানা পদের খাবার তৈরির তোড়জোড় চলে। বাজারগুলো তাজা ফলমূল এবং শাকসবজিতে ভরে ওঠে। এটিকে ওনামের অন্যতম ব্যস্ত দিন বলা চলে।
৫. পঞ্চম দিন: অনিঝাম (Anizham)
এই দিনের প্রধান আকর্ষণ হলো কেরলের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ বা ‘ভাল্লামকালি’ (Vallamkali)। পাম্বা নদীতে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার মানুষ এই রোমাঞ্চকর নৌকা বাইচ দেখতে নদীর পাড়ে ভিড় করেন।
৬. ষষ্ঠ দিন: থ্রিকেন্তো (Thriketa)
এই সময় কেরলে ছুটি শুরু হয়ে যায়। দূর-দূরান্তে থাকা মানুষজন পরিবারের সাথে উৎসব কাটাতে বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। আনন্দের আবহে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে এবং পুকালমের নকশা আরও জটিল ও সুন্দর করা হয়।
৭. সপ্তম দিন: মূলাম (Moolam)
এই দিন থেকে কেরলের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ‘পুলি কালি’ (Puli Kali) বা ব্যাঘ্র নৃত্য এবং কাইকোট্টিকালি নৃত্যের মহড়া ও পরিবেশন শুরু হয়। বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয় এবং উৎসবের আমেজ চূড়ান্ত রূপ নিতে শুরু করে।
৮. অষ্টম দিন: পুরাদম (Pooradam)
এই দিনে মাটি দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ‘অনথাপ্পান’ (Onathappan) বা বামন মূর্তি এবং মহাবলীর মূর্তি তৈরি করে পুকালমের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। এই আচারটি উৎসবের অন্যতম প্রধান অংশ।
৯. নবম দিন: উথ্রাদম (Uthradom)
এটিকে ‘অনুধাম ওনাম’ বা মূল উৎসবের আগের দিন বলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, রাজা মহাবলী এই দিনে কেরল রাজ্যে প্রবেশ করেন। প্রজারা তাঁদের প্রিয় রাজাকে স্বাগত জানাতে সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। এটিকে কেরলে অত্যন্ত পবিত্র দিন মনে করা হয়।
১০. দশম দিন: থিরুভোনাম (Thiruvonam)
এটিই ওনামের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে রাজা মহাবলী প্রতিটি ঘরে ঘরে যান এবং প্রজাদের আশীর্বাদ করেন। এই দিনের মূল আকর্ষণ হলো ‘ওনাসাদিয়া’ (Onasadhya), যা কলাপাতায় পরিবেশন করা ২৬টিরও বেশি পদের একটি ঐতিহ্যবাহী ভোজ। সবাই নতুন পোশাক পরে, উপহার বিনিময় করে এবং আতশবাজি পুড়িয়ে আনন্দ উৎসব শেষ করে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ফসলি উৎসবের আনন্দ: ওনাম কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী নয়, এটি কেরলের কৃষিজীবী মানুষের নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম। টানা ১০ দিন ধরে এই আনন্দ উদযাপিত হয়।
- সাংস্কৃতিক মিলনমেলা: এই ১০ দিনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কেরলের সমস্ত মানুষ এক হয়ে উৎসবে শামিল হন, যা সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন Why Onam is celebrated for 10 days? রাজা মহাবলীর আগমনকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে তাঁর বিদায় এবং নতুন ফসলের আনন্দকে উদযাপন করতেই এই ১০ দিনের আয়োজন। এটি কেরলের সমৃদ্ধ heritage বা ঐতিহ্য, আতিথেয়তা এবং ঐক্যের প্রতীক।
আতিথ্য ও সংস্কৃতির এই মরশুমে কেরলের এই জীবনশৈলী আমাদের জীবনের এক ইতিবাচক বার্তা দেয়।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













