বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হাস্যরস ও ননসেন্স ক্লাসিক ধারার নাম উঠলেই সবার আগে যে নামটি মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে, তিনি সুকুমার রায়। ৩০ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন। আজকের এই বিশেষ দিনে সাহিত্যপ্রেমী বাঙালি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উদযাপন করছে Sukumar Roy Birth Anniversary। ক্ষণজন্মা এই সাহিত্যিক মাত্র ছত্রিশ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়ে গেছেন, তা শতবর্ষ পেরিয়েও সমান জীবন্ত, প্রাসঙ্গিক এবং অনন্য। ছোট-বড় সব বয়সের পাঠকের কাছেই তিনি এক অফুরন্ত আনন্দের উৎস।
হাসির আড়ালে সমাজবীক্ষণ: ননসেন্স ছড়ার আধুনিকতা
সুকুমার রায়ের সাহিত্যকর্ম কেবল শিশুদের নিছক আনন্দ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সৃষ্ট ‘আবোল তাবোল’, ‘হ য ব র ল’ কিংবা ‘পাগলা দাশু’র মতো সৃষ্টিগুলোর গভীর স্তরে লুকিয়ে ছিল প্রখর সামাজিক সচেতনতা ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের ঔপনিবেশিক বাঙালি সমাজের গোঁড়ামি, বাবু কালচার এবং প্রশাসনিক ভণ্ডামিকে তিনি হাসির মোড়কে অদ্ভুত দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন। ‘একুশে আইন’-এর অদ্ভুত সব নিয়মাবলি অথবা ‘রামগরুড়ের ছানা’র হাসতে না পারার অভিশাপ—সবকিছুর পেছনেই ছিল ব্রিটিশ রাজ ও তৎকালীন সমাজের অন্ধ অচলায়তনের প্রতি এক সপ্রতিভ প্রতিবাদ। অদ্ভুত ছন্দ ও আপাত যুক্তিহীন শব্দের মেলায় তিনি তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি সাহিত্যের ভাষা, যা বিশ্বসাহিত্যের লুইস ক্যারল বা এডওয়ার্ড লিয়ারের সমকক্ষ।
বিজ্ঞানের ছাত্র থেকে মুদ্রণশিল্পের পথিকৃৎ
অনেকেই হয়তো সাহিত্যিক সুকুমার রায়কে চেনেন, কিন্তু প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের জগতে তাঁর অবদান অনেকের কাছেই অজানা। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে স্নাতক হওয়ার পর তিনি উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি ফটোগ্রাফি ও প্রিন্টিং টেকনোলজি (হাফ-টোন প্রসেস) নিয়ে গভীর গবেষণা চালান।
লন্ডন থেকে ফিরে এসে তিনি পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রেসের আধুনিকায়ন করেন। ভারতে আধুনিক রঙিন মুদ্রণ প্রযুক্তির প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সম্পাদনায় বের হওয়া ‘সন্দেশ’ পত্রিকা কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য সাহিত্যের আকর ছিল না, বরং উন্নত মুদ্রণ ও নান্দনিক অলংকরণের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে উঠেছিল।
বহুমাত্রিক প্রতিভা: লেখক যখন নিজেই চিত্রশিল্পী
সুকুমার রায়ের লেখার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো তাঁর আঁকা স্কেচ ও চিত্রকর্ম। ‘হিজিবিজবিজ’, ‘হুঁকোমুখো হ্যাংলা’, ‘কুমড়োপটাশ’ কিংবা ‘বোম্বাগড়ের রাজা’—চরিত্রগুলোকে তিনি কেবল লেখনীতেই ফুটিয়ে তোলেননি, নিজের হাতে আঁকা অদ্ভুত ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে তাদের রক্ত-মাংসের রূপ দিয়েছিলেন। লেখার কল্পনার সঙ্গে রেখার এমন নিখুঁত মেলবন্ধন বিশ্বসাহিত্যে অত্যন্ত বিরল। তাঁর প্রতিটি কার্টুন ও স্কেচ চরিত্রগুলোর অবাস্তবতাকে চোখের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
বর্তমান ডিজিটাল সময়ে সুকুমার রায়ের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে প্রশ্ন জাগতে পারে, সুকুমার রায় আজও কতটা প্রাসঙ্গিক? উত্তরটা অত্যন্ত স্পষ্ট—আজকের দিনে তাঁর প্রয়োজন আরও বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ার মিম সংস্কৃতি, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গচিত্র এবং চটুল কনটেন্টের ভিড়ে সুকুমার রায়ের পরিশীলিত অথচ প্রচণ্ড ধারালো রসিকতা এক অপার প্রেরণা।
আধুনিক তরুণ প্রজন্ম যখন মানসিক চাপ ও কৃত্রিম জীবনধারায় অভ্যস্ত, তখন সুকুমার রায়ের একটি সাধারণ ছড়া বা গল্প মুহূর্তের মধ্যে অনাবিল আনন্দ এনে দেয়। তাঁর চরিত্রগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সমান আবেদন রেখে চলেছে। যেকোনো বয়সেই তাঁর লেখায় ফিরে যাওয়া মানেই শৈশবের সেই বিশুদ্ধ বিস্ময়ের জগতে অবগাহন করা।
উত্তরাধিকার ও শতবর্ষ পেরিয়েও চিরন্তন দীপ্তি
১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ব্ল্যাক ওয়াটার ফিভারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এই মহান স্রষ্টার অকালপ্রয়াণ ঘটে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি লিখেছিলেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘আবোল তাবোল’-এর সেই বিখ্যাত সমাপনী পঙক্তি—“আদিম কালের চাঁদিম গায়, গান শুনিয়ে কানটি জুড়ায়…”। তিনি শারীরিকভাবে হারিয়ে গেলেও রেখে গেছেন এমন এক সাহিত্যের সাম্রাজ্য, যা বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে।
Sukumar Roy Birth Anniversary কেবল একটি বিশেষ দিন বা আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; এটি বাংলা ভাষার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভাকে নতুন করে আবিষ্কার করার দিন। নতুন প্রজন্মের কাছে সুকুমার রায়কে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর যুক্তিনির্ভর, বৈজ্ঞানিক মনন ও মুক্তচিন্তার ধারাকে লালন করাই হতে পারে এই জন্মদিনে আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













