সুদীপ্ত সাউ, কলকাতা: রবি মরসুমের অন্যতম প্রধান ও লাভজনক অর্থকরী তৈলবীজ ফসল হলো সরিষা। সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন এবং সময়মতো পরিচর্যা করলে সরিষা চাষ থেকে অল্প খরচে দ্বিগুণ লাভ ঘরে তোলা সম্ভব। তবে সরিষা চাষে সফলতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এর রোপণ ও কাটার সঠিক দিনক্ষণের ওপর। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে Mustard Sowing and Harvesting Time নিখুঁতভাবে মেনে চললে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হয় এবং তেলের গুণমান সর্বোচ্চ থাকে।
সরিষা চাষের অনুকূল আবহাওয়া ও মাটি
সরিষা মূলত ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার ফসল। গাছ বৃদ্ধির সময় ১৮°C থেকে ২৫°C তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযুক্ত।
- মাটি: বেলে-দোআঁশ বা পলি-দোআঁশ মাটি সরিষা চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।
- নিষ্কাশন: জমিতে যেন কোনোভাবেই জল না জমে, কারণ জলাবদ্ধতা সরিষা গাছের শিকড় পচিয়ে দেয়।
- মাটির pH: ৬.০ থেকে ৭.৫ মাত্রার মাটির অম্লত্ব সরিষার ভালো বৃদ্ধির জন্য অনুকূল।
Mustard Sowing Time: সরিষা বীজ বোনার সেরা সময়
সরিষার উৎপাদন কতটা ভালো হবে, তা নির্ভর করে বীজ বপনের সময়ের ওপর। বীজ বপনে সামান্য দেরি হলেও জাবপোকা বা এফিড (Aphid)-এর আক্রমণ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং দানা আকারে ছোট হয়ে যায়।
- সেরা সময়: মধ্য-অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ (১৫ অক্টোবর – ১০ নভেম্বর)। এই সময়ে দিনের তাপমাত্রা সহনশীল থাকে এবং মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা অঙ্কুরোদগমে দ্রুত সাহায্য করে।
- নাবী বা দেরিতে বপন: আমন ধান কাটার পর জমি তৈরি করে নভেম্বরের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যেও কিছু স্বল্পমেয়াদী জাতের বীজ বোনা যায়। তবে ১৫ নভেম্বরের পরে বপন করলে ফলন গড়ে ২০-৩০% কমে যেতে পারে।
- বীজ শোধন ও বপন পদ্ধতি: প্রতি কেজি বীজের সাথে ২ গ্রাম থাইরাম বা কার্বেনডাজিম মিশিয়ে বীজ শোধন করা উচিত। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০-১২ সেমি রাখলে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা ও জলসেচ
বীজ বোনার পর সঠিক সময়ে আগাছা দমন ও সেচ প্রদান ফলন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে:
- গাছ পাতলা করা: বীজ বোনার ১৫-২০ দিন পর অতিরিক্ত চারা তুলে পাতলা করতে হবে।
- প্রথম সেচ: ফুল আসার ঠিক আগে, অর্থাৎ বীজ বোনার ২৫-৩০ দিনের মাথায় হালকা সেচ দিতে হবে।
- দ্বিতীয় সেচ: শুঁটিতে দানা গঠনের সময় (বপনের ৫০-৫৫ দিন পর) দ্বিতীয় সেচ দেওয়া জরুরি। এই সময়ে কোনোভাবেই জমিতে অতিরিক্ত জল জমিয়ে রাখা চলবে না।
Mustard Harvesting Time: সরিষা কাটার সঠিক সময় ও পদ্ধতি
গাছে দানা পরিপক্ব হওয়ার সাথে সাথেই ফসল কাটার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অসময়ে বা অতিরিক্ত দেরিতে কাটলে মাঠেই শুঁটি ফেটে প্রচুর বীজ নষ্ট হয়ে যায়, আবার সময়ের আগে কাটলে দানায় তেলের পরিমাণ ও ওজন কমে যায়।
- কাটার আদর্শ সময়: জাতভেদে বীজ বোনার ৮০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে সরিষা তোলার উপযোগী হয়। সাধারণত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত ফসল কাটার কাজ চলে।
- পরিপক্বতার লক্ষণ:
- গাছের পাতা ও কাণ্ড ধীরে ধীরে শুকিয়ে হলুদ বা বাদামি বর্ণ ধারণ করবে।
- শতকরা ৭৫-৮০ ভাগ শুঁটি সোনালী-হলুদ রঙে রূপ নেবে।
- শুঁটির ভেতরের বীজ চাপ দিলে শক্ত লাগবে এবং নির্দিষ্ট জাতের রঙ (কালো, লালচে বা হলুদ) স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
- ফসল তোলার সঠিক নিয়ম: সকালের দিকে হালকা কুয়াশা বা আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় ফসল কাটা উচিত। দুপুরের রোদে শুঁটি শুকিয়ে ফেটে গিয়ে দানা ঝরে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
মাড়াই ও সংরক্ষণ
কাটার পর সরিষার গাছ ছোট ছোট আঁটি বেঁধে রোদে ২-৩ দিন শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা আধুনিক থ্রেশার মেশিনের সাহায্যে বীজ আলাদা করতে হয়।
সংরক্ষণের আগে দানাগুলো পরিষ্কার করে কড়া রোদে এমনভাবে শুকাতে হবে যেন দানার আর্দ্রতার পরিমাণ ৮-৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে। পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার পর বায়ুরোধী পাত্র বা পলিথিন দেওয়া পাটের বস্তায় সংরক্ষণ করলে দীর্ঘ সময় বীজের গুণমান ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা অটুট থাকে।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













