প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও শক্তিশালী লীলাভূমির নাম জাপান। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ (Ring of Fire)-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় এই দেশটিতে প্রায়শই বড় বড় ভূকম্পন আঘাত হানে। সম্প্রতি আবারও একটি বড়সড় ঝাঁকুনি দেখল সূর্যোদয়ের দেশ। 7.2 magnitude earthquake Japan— অর্থাৎ, ৭.২ তীব্রতার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এই ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করলেও স্বস্তির বিষয় হলো, এবার কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি।
কখন এবং কোথায় আঘাত হানে এই ভূমিকম্প?
স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তরের (Japan Meteorological Agency) রিপোর্ট অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালের ব্যস্ত সময়ে (Rush Hour) হঠাৎ করেই এই তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর প্রাথমিক মাত্রা ৬.৯ ধরা হলেও, পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে ৭.২ বলে নিশ্চিত করা হয়।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইওয়াতে (Iwate) প্রিফেকচারের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকায়। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ৪৪ থেকে ৫০ কিলোমিটার। শক্তিশালী এই কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে, উৎপত্তিস্থল থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজধানী টোকিও পর্যন্ত মৃদুভাবে কেঁপে ওঠে।
ক্ষয়ক্ষতি এবং আহতের খবর
৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প যেকোনো দেশের জন্যই চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও ভূকম্পন-সহনীয় পরিকাঠামোর কারণে এবার বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
- আহতের সংখ্যা: স্থানীয় ফায়ার ডিপার্টমেন্ট ও উদ্ধারকারী দলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমোরি (Aomori) এবং ইওয়াতে প্রিফেকচারে অন্তত ৮ জন সাধারণ মানুষ সামান্য আহত হয়েছেন।
- আঘাতের ধরন: আহতদের বেশিরভাগই ঘরবাড়ির ভেতরের আসবাবপত্র বা উপর থেকে কোনো জিনিস ছিটকে পড়ার কারণে চোট পেয়েছেন। তবে কারও আঘাতই জীবনঘাতী নয়।
- স্কুল-কলেজ বন্ধ: ভূমিকম্পের পরপরই শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে হাচিনোহে এবং হাশিকামি অঞ্চলের প্রায় ৭০টিরও বেশি স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
জাপানি তীব্রতা স্কেল (Shindo Scale): জাপানের নিজস্ব ভূমিকম্প পরিমাপক স্কেলে এই কম্পনের তীব্রতা ছিল ‘আপার ৬’ (Upper 6)। এই মাত্রার কম্পনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ঘরের ভেতরের ভারী আসবাবপত্র অনায়াসে স্থানচ্যুত হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পারমাণবিক কেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি
সকালের ব্যস্ত সময়ে এই দুর্যোগ আসায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে জাপানের বুলেট ট্রেন বা শিনকানসেন (Shinkansen) পরিষেবার ওপর। টোহোকু এবং আকিতা শিনকানসেন লাইনের ট্রেন চলাচল সুরক্ষার খাতিরে তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করা হয়। রেললাইনের ট্র্যাকগুলো ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করার পর দুপুরের দিকে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, জাপানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সারাবিশ্বেই সবসময় উদ্বেগ থাকে। ২০১১ সালের ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির কথা মাথায় রেখে এবারও দ্রুত অনুসন্ধান চালানো হয়। তবে আশার কথা হলো, হোক্কাইদো, ওনাগাওয়া কিংবা ফুকুশিমা দাইইচি ও দাইনি পারমাণবিক কেন্দ্রে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা বা তেজস্ক্রিয়তা ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি।
কেন জাপানে এত ঘনঘন ভূমিকম্প হয়?
ভৌগোলিক গঠনের দিক থেকে জাপান অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবী প্রধানত কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জাপান এমন একটি জায়গায় অবস্থিত যেখানে মূলত চারটি বড় টেকটোনিক প্লেট (ইউরেশিয়ান, প্যাসিফিক, ফিলিপাইন এবং উত্তর আমেরিকান প্লেট) একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছে।
এই প্লেটগুলোর অনবরত নড়াচড়া এবং একে অপরের ওপর চাপের ফলেই জাপানে প্রতি বছর হাজার হাজার ছোট-বড় ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। এছাড়াও দেশটিতে প্রায় ১০০টিরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতিকে সবসময়ই অস্থির করে রাখে।
আগামী কয়েকদিনের জন্য সতর্কতা
ভূমিকম্পের তীব্র ধাক্কা কেটে গেলেও জাপানের আবহাওয়া দপ্তর (JMA) স্থানীয় নাগরিকদের আগামী অন্তত এক সপ্তাহ অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে আফটারশক বা অনুকম্পনের (Aftershocks) কারণে যেকোনো সময় আবারও মাঝারি থেকে ভারী মাত্রার ঝাঁকুনি হতে পারে।
জাপানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi) এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সরকার মানুষের জীবন রক্ষার্থেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দুর্গতদের দ্রুত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে সরকারি জরুরি টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাতের সামনে দাঁড়িয়েও জাপানের উন্নত প্রযুক্তির আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের সচেতনতাই এবার বড় ধরণের বিপর্যয় রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।













