ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাতায় যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব নিজেদের দূরদর্শিতা এবং আদর্শের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। প্রতি বছর তাঁর জন্মদিনটি (Shyamaprasad Mukherjee Birthday) অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। স্বাধীন ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা এবং বাঙালি হিন্দুদের অধিকার সুরক্ষায় তাঁর অবদান আজও এক বড় অনুপ্রেরণা।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং কেন বর্তমান ভারতেও তাঁর জন্মদিনটি এতখানি তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাগত কৃতিত্ব
১৯০১ সালের ৬ই জুলাই অবিভক্ত বাংলার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যিনি ‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিত ছিলেন।
পারিবারিক পরিবেশ থেকেই শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন প্রখর মেধা ও জাতীয়তাবাদী চেতনা। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য (Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সংস্কারমূলক চিন্তাভাবনা এবং বাংলা ভাষাকে উচ্চশিক্ষার স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা আজও প্রশংসিত হয়।
রাজনৈতিক জীবন এবং ভারত বিভাজনে তাঁর ভূমিকা
ড. মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। তিনি প্রথম জীবনে হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
- পশ্চিমবঙ্গ গঠন: ভারতের ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো আজকের ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্যের সৃষ্টি। দেশভাগের সময় যখন সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার একটি পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছিল, তখন তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি তোলেন যে, বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতের সাথেই থাকবে। তাঁর এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণেই আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ ও জনসংঘ প্রতিষ্ঠা
পণ্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও, ১৯৫০ সালে লিয়াকত-নেহরু চুক্তির প্রতিবাদে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে নেহরু সরকারের নরম নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি।
এরপর ১৯৫১ সালের ২১শে অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) সহযোগিতায় ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই জনসংঘই হলো আজকের বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (BJP)-র পূর্বসূরি।
কাশ্মীরের আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক বলিদান
“এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান এবং দুই নিশান চলবে না”— এই স্লোগান দিয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা জারির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তৎকালীন নিয়মানুযায়ী, ভারতের যেকোনো নাগরিকের কাশ্মীরে প্রবেশ করতে গেলে বিশেষ পারমিটের প্রয়োজন হতো।
১৯৫৩ সালের মে মাসে তিনি কোনো পারমিট ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২৩শে জুন, ১৯৫৩ সালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর এই মৃত্যুকে আজও অনেকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে মনে করেন। তাঁর এই বলিদানের ফলেই পরবর্তীকালে কাশ্মীরে পারমিট রাজের অবসান ঘটে।
বর্তমান সময়ে Shyamaprasad Mukherjee Birthday-র তাৎপর্য
প্রতি বছর ৬ই জুলাই ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী দেশজুড়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়। বর্তমান ভারত সরকারের অনেক বড় বড় সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে তাঁরই আদর্শ। বিশেষ করে ২০১৯ সালে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপের মাধ্যমে ড. মুখোপাধ্যায়ের “এক দেশ, এক বিধান”-এর স্বপ্ন সফল হয়েছে বলে মনে করা হয়।
আজকের দিনে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, রক্তদান শিবির এবং সেমিনারের মাধ্যমে তাঁর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সর্বশেষে বলতে পারি
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, শিক্ষাবিদ এবং চিন্তাবিদ। সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের অখণ্ডতাকে তিনি সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর জন্মদিনে (Shyamaprasad Mukherjee Birthday) আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত তাঁর দেখানো দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী পথ অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী ও একতাবদ্ধ ভারত গড়ে তোলা।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













