সুদীপ্ত সাউ, কলকাতা: শারদীয় ও বাসন্তী নবরাত্রির প্রতিটি তিথি সনাতন ধর্মে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আদ্যাশক্তি মহামায়ার নয়টি স্বতন্ত্র রূপ অর্থাৎ নবদুর্গার আরাধনায় ভক্তরা আত্মনিয়োগ করেন। এই পুণ্য উৎসবের চতুর্থ দিনটি অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক গুরুত্বে ভরপুর। Navratri 2026 Day 4 Devi হলেন দেবী কুষ্মাণ্ডা। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি শক্তি হিসেবে দেবী কুষ্মাণ্ডা বিরাজমান।
আপনি কি জানেন চতুর্থ দিনের এই বিশেষ আরাধনা কেন আপনার জীবনে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার ঘটাতে পারে? আসুন বিস্তারিত জেনে নিই মা কুষ্মাণ্ডার রূপ, পূজা বিধি, মন্ত্র এবং ভোগ নিবেদনের সঠিক নিয়ম।
কে এই দেবী কুষ্মাণ্ডা? মহাজাগতিক সৃষ্টির নেপথ্য শক্তি
‘কুষ্মাণ্ডা’ শব্দটি তিনটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—’কু’ (ঈষৎ বা সামান্য), ‘উষ্মা’ (উত্তাপ বা শক্তি) এবং ‘অণ্ড’ (মহাজাগতিক ডিম্ব বা ব্রহ্মাণ্ড)। অর্থাৎ যিনি নিজের মৃদু ও পবিত্র হাসির উষ্ণতায় এই শূন্য ব্রহ্মাণ্ডকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই দেবী কুষ্মাণ্ডা।
পুরাণ মতে, সৃষ্টির প্রাক্কালে চারিদিকে কেবল ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজ করছিল। কোনো আলো বা প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না। সেই সময় আদি পরাশক্তি দেবী দুর্গা এক ঈষৎ হাস্য প্রকাশ করেন এবং সেই হাসির তেজ থেকেই সমগ্র মহাবিশ্বে আলোর জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ে। দেবী সূর্যের মণ্ডলে বাস করেন বলে তাঁর শারীরিক তেজ কোটি সূর্যের সমান।
দেবী কুষ্মাণ্ডার রূপের বৈশিষ্ট্য:
- তিনি অষ্টভুজা—তাঁর আটটি হাতে রয়েছে যথাক্রমে ধনুক, বাণ, চক্র, গদা, পদ্ম, অমৃত কলশ, কমণ্ডলু এবং সর্বসিদ্ধি প্রদানকারী জপমালা।
- দেবীর বাহন সিংহ, যা পরাক্রম ও সাহসের প্রতীক।
- তাঁর মুখে সদা বিরাজ করে মৃদু প্রসন্ন হাসি, যা ভক্তের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট দূর করার আশ্বাস দেয়।
Navratri 2026 Day 4 Devi: পূজা পদ্ধতি ও শুভ সংকল্প
নবরাত্রির চতুর্থ দিনে ভক্তরা ভোরবেলা স্নান সেরে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল বস্ত্র পরিধান করেন। দেবী কুষ্মাণ্ডা সূর্যের অন্তর্গত শক্তির প্রতীক, তাই এই দিনে কমলা (Orange) বা হলুদ রঙের পোশাক পরিধান করা অত্যন্ত শুভ ও ফলদায়ী বলে মনে করা হয়।
১. বেদী প্রস্তুতি: একটি কাঠের চৌকিতে লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে মা দুর্গা ও দেবী কুষ্মাণ্ডার ছবি বা ঘট স্থাপন করুন। ২. আবাহন ও অর্ঘ্য: গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেবীকে আমন্ত্রণ জানান। চন্দন, কুমকুম, অক্ষত ও লাল জবা ফুল দেবীর চরণে অর্পণ করুন। ৩. ধূপ ও দীপ প্রজ্জ্বলন: ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরতি শুরু করুন। দেবীর তেজ সূর্যের প্রতীক হওয়ায় প্রদীপের জ্যোতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৪. সংকল্প গ্রহণ: পরিবারে সুখ, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় মনে মনে সংকল্প নিন।
মা কুষ্মাণ্ডার প্রিয় ভোগ ও নৈবেদ্য
লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্র অনুসারে, দেবী কুষ্মাণ্ডার নাম কুমড়োর (কুষ্মাণ্ড) সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই বলিপ্রথার বিকল্প হিসেবে দেবীকে চালকুমড়ো বা মিষ্টি কুমড়ো নিবেদন করা হয়।
- মালপোয়া: দেবী কুষ্মাণ্ডার সবচেয়ে প্রিয় প্রসাদ হলো মালপোয়া। বিশুদ্ধ ঘি-এ ভাজা মালপোয়া নিবেদন করলে মা অত্যন্ত প্রসন্ন হন।
- মিষ্টান্ন ও ফল: মিষ্টি দই, লাড্ডু এবং মৌসুমি ফল নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া যায়।
- পূজা শেষে এই ভোগ পরিবারের সবার মাঝে এবং দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করলে গ্রহদোষ কাটে বলে বিশ্বাস।
সিদ্ধি ও আরোগ্য লাভের জন্য বিশেষ মন্ত্র
দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা করার সময় বিশুদ্ধ উচ্চারণে মন্ত্র জপ করা উচিত। এতে একাগ্রতা বাড়ে এবং মনের ভেতরের নেতিবাচক চিন্তা নির্মূল হয়।
ধ্যান মন্ত্র: “সুরাসম্পূর্ণকলশং রুধিরপ্লুতমেব চ। দধানা হস্তপদ্মাভ্যাং কুষ্মাণ্ডা শুভদাস্তু মে॥”
সরল বীজ মন্ত্র: “ওঁ দেবী কুষ্মাণ্ডায়ৈ নমঃ”
পূজার সময় শান্ত মনে এই মন্ত্র ১০৮ বার জপ করলে রোগ-শোক ও মানসিক অবসাদ দূর হয়।
জ্যোতিষ ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ: অনাহত চক্রের জাগরণ
যোগসাধনায় নবরাত্রির চতুর্থ দিনের তাৎপর্য অপরিসীম। সাধকেরা এই দিনে তাঁদের ধ্যান কেন্দ্রীভূত করেন ‘অনাহত চক্র’ বা হৃদয় চক্রে। যাঁদের মন চঞ্চল, আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে কিংবা দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন, দেবী কুষ্মাণ্ডার সাধনা তাঁদের নতুন জীবনীশক্তি প্রদান করে।
জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, মা কুষ্মাণ্ডা সূর্য দেবতাকে পরিচালিত করেন। কুণ্ডলীতে সূর্যের প্রতিকূল অবস্থান থাকলে জীবনে যশ ও খ্যাতির অভাব ঘটে। চতুর্থ দিনে দেবীর একনিষ্ঠ আরাধনা সেই কুপ্রভাব কাটিয়ে যশ, বীর্য ও স্বাস্থ্য সুদৃঢ় করতে সাহায্য করে।
নবরাত্রির এই পবিত্র তিথিতে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিক ভক্তিই মুখ্য। মা কুষ্মাণ্ডার অপার করুণা আপনার জীবন থেকে যাবতীয় অন্ধকার দূর করে আনুক অনাবিল আলো ও সমৃদ্ধি।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













