IBM Losses 70 Billion Dollars: বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস বা IBM এর শেয়ার বাজারে ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কোম্পানির প্রাথমিক দ্বিতীয় প্রান্তিকের (Q2) ব্যবসায়িক ফলাফল প্রকাশের পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে IBM-এর মার্কেট ভ্যালু বা বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭০,০০০,০০০,০০০ মার্কিন ডলার) উধাও হয়ে গেছে। এটি বিগত ৫৮ বছরের মধ্যে কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এককালীন পতন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
হঠাৎ কেন এই বিপর্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর জোয়ার কীভাবে এই টেক জায়ান্টের পতন ডেকে আনল, তা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।
IBM Losses 70 Billion Dollars: কেন ধসে পড়ল IBM-এর শেয়ার?
মূলত ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের প্রাথমিক আর্থিক খতিয়ান সামনে আসতেই ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
- রাজস্বে চরম ঘাটতি: বাজারের বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল এই প্রান্তিকে IBM অন্তত ১৭.৮৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আর্ন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা মাত্র ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭.২ বিলিয়ন ডলারে থমকে যায়।
- শেয়ারের মূল্যে ২৫% পতন: এই খারাপ পারফরম্যান্সের খবর ছড়াতেই এক ধাক্কায় কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ২৫.২% কমে যায়। যা ১৯৮৭ সালের বিখ্যাত ‘ব্ল্যাক মান্ডে’র শেয়ার বাজার ধসের চেয়েও মারাত্মক।
“আমরা ব্যর্থ হয়েছি” – CEO অরবিন্দ কৃষ্ণর অকপট স্বীকারোক্তি
এই নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে IBM-এর ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) অরবিন্দ কৃষ্ণ (Arvind Krishna) নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। তিনি সরাসরি বলেন, “আমরা পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে ভুল করেছি এবং বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে যথেষ্ট দ্রুততার সাথে এগোতে পারিনি (We faltered… and did not adapt and move quickly enough)”। তিনি জানান যে, গ্রাহকদের বাজেট হঠাৎ করে অন্য খাতে চলে যাওয়ায় বড় বড় বহু ব্যবসায়িক চুক্তি সময়মতো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
IBM-এর পতনের মূল কারণসমূহ: AI ও প্রযুক্তির নতুন সমীকরণ
বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কী এমন ঘটল যার জন্য ৭০ বিলিয়ন ডলার লোকসান করতে হলো? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দেখিয়েছেন:
১. AI ইনফ্রাস্ট্রাকচারের দিকে গ্রাহকদের ঝোঁক
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে টেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ডেপ্লয় করার ধুম পড়েছে। ফলে বিভিন্ন কর্পোরেট ক্লায়েন্টরা IBM-এর মূল সফটওয়্যার বা ঐতিহ্যবাহী মেইনফ্রেম কম্পিউটার কেনার বাজেট কমিয়ে দিয়েছে। তারা সেই টাকা এখন AI সার্ভার, স্টোরেজ ডিভাইস এবং মেমোরি চিপ (DRAM ও NAND ফ্ল্যাশ) কেনার পেছনে খরচ করছে। এই আকস্মিক বাজেট পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে পারেনি কোম্পানিটি।
২. মেইনফ্রেম ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবসায় ধস
IBM-এর আয়ের অন্যতম বড় উৎস হলো তাদের শক্তিশালী মেইনফ্রেম কম্পিউটার (যেমন z17 লাইনআপ), যা বড় বড় ব্যাংক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে। কিন্তু ক্লায়েন্টদের নতুন অগ্রাধিকারের কারণে এই কোয়ার্টারে IBM-এর মূল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিজনেস থেকে আয় প্রায় ৭% কমে গেছে。
৩. অ্যানথ্রোপিকের ‘Mythos’ মডেল ও সাইবার সিকিউরিটি আতঙ্ক
সম্প্রতি বিখ্যাত AI স্টার্টআপ অ্যানথ্রোপিক (Anthropic) তাদের নতুন ‘Mythos’ AI মডেল বাজারে এনেছে। এই মডেলটি কম্পিউটারের নেটওয়ার্কের ভেতরের দুর্বলতা বা বাগ খুব সহজেই খুঁজে বের করতে পারে, যা হ্যাকারদের সুবিধা করে দিতে পারে বলে বাজারে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। ফলে সাধারণ প্রযুক্তি প্রজেক্ট বাদ দিয়ে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো হঠাৎ তাদের বাজেট সাইবার সিকিউরিটি বা সাইবার প্রতিরক্ষা জোরদার করার পেছনে ডাইভার্ট করে দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই IBM-এর তৈরি সফটওয়্যারের বিক্রি কমে যায়।
পুরো সফটওয়্যার সেক্টরে বা “SaaS” ইন্ডাস্ট্রিতে কাঁপন
IBM-এর এই ৭০ বিলিয়ন ডলারের মহা-বিপর্যয় শুধু তাদের একার ক্ষতি করেনি, বরং পুরো সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আইবিএম-এর এই সতর্কবার্তার পর মাইক্রোসফট (Microsoft), সেলসফোর্স (Salesforce), অ্যাডোবি (Adobe), এবং সার্ভিসনাউ (ServiceNow)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার সার্ভিস (SaaS) প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের একাংশ একে “SaaS-pocalypse” বা সফটওয়্যার খাতের মহাবিপর্যয় বলে আখ্যা দিচ্ছেন。
আশার আলো কি একেবারেই নেই?
এত বড় লোকসানের মধ্যেও IBM-এর কিছু ভালো দিক লক্ষ্য করা গেছে। তাদের ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার ইউনিট Red Hat ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এছাড়া নন-মেইনফ্রেম সার্ভার ও স্টোরেজ ব্যবসা থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৩৭%। পরিস্থিতি সামাল দিতে IBM কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ সাইবার সিকিউরিটি প্রজেক্ট ‘Lightwell’ এর ওপর জোর দিচ্ছে।
টেক দুনিয়ায় শত বছরের পুরোনো ও অপরাজেয় ভাবা IBM-এর এই পতন প্রমাণ করে যে, AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই যুগে যেকোনো সময় সমীকরণ বদলে যেতে পারে। আগামী ২২শে জুলাই কোম্পানিটির চূড়ান্ত Q2 আর্থিক রিপোর্ট প্রকাশ পাবে, যেখানে বোঝা যাবে এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ‘বিগ ব্লু’ (IBM) নতুন কী রণকৌশল অবলম্বন করতে চলেছে।













