Parivartini Ekadashi Vrat Katha: ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথি সনাতন ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র ও ফলদায়ী এক তিথি হিসেবে গণ্য হয়। বৈষ্ণব ঐতিহ্য অনুসারে এই তিথিটি পরিবর্তিনী একাদশী (Parivartini Ekadashi) নামে পরিচিত। কথিত আছে, ক্ষীরসাগরে অনন্ত শয্যায় শায়িত ভগবান শ্রীবিষ্ণু এই দিনে তাঁর শয়নের পাশ পরিবর্তন করেন, অর্থাৎ বাঁ দিক থেকে ডান দিকে পাশ ফেরেন। এই মহাজাগতিক পরিবর্তনের কারণেই একে ‘পরিবর্তিনী’ বা ‘পার্শ্ব একাদশী’ বলা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, নিষ্ঠাভরে এই ব্রত পালন করলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায় এবং বাজপেয় যজ্ঞের সমতুল্য পুণ্য লাভ হয়।
পরিবর্তনের তাৎপর্য ও ব্রতের গুরুত্ব
চাতুর্মাসের চার মাস ভগবান শ্রীবিষ্ণু যোগনিদ্রায় মগ্ন থাকেন। আষাঢ়ের দেবশয়নী একাদশীতে শুরু হওয়া এই মহানিদ্রার ঠিক মাঝপথে আসে ভাদ্রের এই তিথি। জ্যোতিষ ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে এটি মানবদেহে ইতিবাচক শক্তি সঞ্চার ও মনের মলিনতা পরিবর্তনের দিন।
পুরাণ মতে, পরিবর্তনের এই তিথিতে উপবাস রাখলে ত্রিলোকের অধিপতি শ্রীহরির পাশাপাশি মা লক্ষ্মীর বিশেষ কৃপাদৃষ্টি লাভ করা যায়। ভক্তের পার্থিব সংকট মোচনের পাশাপাশি অন্তিমে মোক্ষ লাভের পথ সুগম হয়।
Parivartini Ekadashi Vrat Katha: মূল পৌরাণিক কাহিনী
মহাভারতে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে ভাদ্র শুক্লপক্ষের এই একাদশীর তাৎপর্য জানতে চেয়েছিলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরম ধার্মিক দৈত্যরাজ বলি ও বিষ্ণুর বামন অবতারের অলৌকিক কাহিনী শোনান।
ত্রেতাযুগে বলি নামে এক প্রবল পরাক্রমশালী অথচ পরম দানশীল অসুররাজা ছিলেন। তিনি ইন্দ্র সহ সমস্ত দেবতাকে পরাস্ত করে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—এই ত্রিভুবনের অধিপতি হন। সিংহাসনচ্যুত দেবতারা গভীর বিপদে পড়ে ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। দেবগণের আকুল প্রার্থনায় শ্রীহরি তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে তিনি বলির ঔদ্ধত্য দূর করে স্বর্গের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।
ভগবান বিষ্ণু এক তেজস্বী বামন ব্রহ্মচারীর রূপ ধারণ করে রাজা বলির অশ্বমেধ যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। রাজা বলি বামন রূপী দেবকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে ইচ্ছামতো দান চাওয়ার অনুরোধ করলেন। বামনদেব স্মিতহাস্যে বললেন, “রাজন, আমার কেবল নিজ পদক্ষেপে পরিমাপ করা তিন পা ভূমি প্রয়োজন।”
বলির গুরু শুক্রাচার্য বুঝতে পেরেছিলেন এই বামন সাধারণ কেউ নন, স্বয়ং নারায়ণ। তিনি বলিকে দান দিতে নিষেধ করলেন। কিন্তু সত্যবাদী বলি নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে পিছপা হলেন না।
দান সংকল্প সমাপ্ত হতেই বামন রূপ এক বিশাল বিশ্বরূপে রূপান্তরিত হলো।
- প্রথম পদক্ষেপে ভগবান সমগ্র মর্ত্যলোক ও পাতাল মেপে নিলেন।
- দ্বিতীয় পদক্ষেপে তিনি সমগ্র স্বর্গলোক গ্রাস করলেন।
এরপর শ্রীহরি বলিকে প্রশ্ন করলেন, “হে রাজন, তোমার সমস্ত রাজ্য তো দুই পদেই পূর্ণ হলো, এখন আমার তৃতীয় পদক্ষেপটি কোথায় রাখব?”
নিরহংকার ও প্রকৃত ভক্ত রাজা বলি দ্বিধাহীন চিত্তে মস্তক অবনত করে বললেন, “প্রভু, আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই, আপনি আপনার তৃতীয় পদটি আমার মস্তকে স্থাপন করুন।”
ভগবান বিষ্ণু বলির এই অটল ভক্তি ও আত্মনিবেদনে পরম সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বলির মাথায় পা রেখে তাকে পাতালের অধিপতি করে দিলেন এবং বর দিলেন যে তিনি স্বয়ং চিরকাল পাতালদ্বারে বলির প্রহরী হিসেবে অবস্থান করবেন। চাতুর্মাসে যোগনিদ্রার সময়েও ভগবান এক রূপে পাতাললোকে এবং অন্য রূপে ক্ষীরসাগরে অবস্থান করেন। এই বিশেষ তিথিতেই ভগবান পাশ ফিরে শয়ন করেন বলে একে পরিবর্তিনী একাদশী হিসেবে পূজা করা হয়।
ব্রত পালনের সহজ নিয়ম ও পূজাবিধি
গৃহস্থ হোক বা সাধক, সাধারণ কিছু আচার মেনে ঘরেই এই ব্রত সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়:
- সংকল্প ও প্রাতঃস্নান: একাদশীর দিন সূর্যোদয়ের পূর্বে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন। ঠাকুরের আসনে শ্রীবিষ্ণু বা শালগ্রাম শিলার সামনে ব্রতের সংকল্প নিন।
- পূজার নৈবেদ্য: ভগবানকে পঞ্চামৃত দিয়ে স্নান করিয়ে চন্দন, হলুদ ফুল ও তুলসী পাতা নিবেদন করুন। মনে রাখবেন, বিষ্ণুপূজায় তুলসী পাতা অপরিহার্য।
- ভোগ অর্পণ: ঋতুভিত্তিক ফল, পঞ্চমেওয়া এবং ঘরে তৈরি শুদ্ধ মিষ্টি ভোগ হিসেবে দিন।
- পাঠ ও জপ: ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে ভক্তিভরে Parivartini Ekadashi Vrat Katha পাঠ করুন বা শ্রবণ করুন। এরপর শান্ত মনে ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ মহামন্ত্র জপ করুন।
- পরদিনের পারণ: একাদশীর সারা দিন অন্ন গ্রহণ না করে ফলাহার বা নির্জলা থাকা শ্রেয়। দ্বাদশীর দিন প্রাতঃকালে পুনরায় পূজা সেরে কোনো ব্রাহ্মণ বা দুস্থ মানুষকে সাধ্যমতো অন্ন-বস্ত্র দান করে তবেই উপবাস ভঙ্গ (পারণ) করুন।
শুদ্ধ মন, অহিংস আচরণ এবং শ্রীহরির চরণে পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই এই ব্রতের প্রকৃত ফল লাভ সম্ভব। সংসারের অশান্তি দূর করতে এবং আত্মিক শান্তি অর্জন করতে এই দিনটি এক অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়।
👉এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করতে না চাইলে এখনই আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্ত হন।
📌 Facebook | 📌 WhatsApp | 📌 Twitter | 📌 Telegram | 📌 Google News













